সাল ২০০২ এর শেষভাগ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা না দিয়েই ওয়ালীদে মুহতারাম মাওলানা আব্দুল মুমিন রহ.’র সাথে সিলেট শহরে চলে আসি। তিনি সবে নয়াসড়ক মাদরাসায় ইহতেমামির দায়িত্বে নিযুক্ত হয়েছেন। আব্বাকে কাছে থেকে দেখার, কথা বলার, তার সাথে চলাফেরার আমার তখনই শুরু হয়। এর আগে ক্ষীণ দু’একটি স্মৃতি ছাড়া আর কিছু মনে পড়ে না।
নয়াসড়ক মাদরাসা তখন আলিয়া ছুওম বা আলিয়া চাহারম (জালালাইন) ছিল। তবে মাদরাসা হিসেবে খ্যাতি এবং এর পরিব্যপ্তি খুবই কম ছিল। যতটুকু ছিল তা হিফজ মাদরাসা হিসেবে ছিল। এলাকাবাসী হাফিজি মাদরাসা বলে সম্বোধন করতো। কুরবানি ঈদে পশুর চামড়া আশপাশের অনেক মানুষ মাদরাসায় দিতে চাইত না। তাদের ভাষ্য ও মনোভাব ছিল, এটা ছোট মাদরাসা। হাফিজি মাদরাসা। দরগা মাদরাসা বড় এবং এর পরিচিতি সমগ্র দেশে। সেখানে দেয়া উচিৎ।
মাদরাসার প্রাতিষ্ঠানিক নামও ছিল- মাদরাসায়ে হাফিজিয়া ইসলামিয়া নয়াসড়ক। জামাতে ছাত্রসংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমানে ছিল না। জামাতের তুলনায় হিফয় বিভাগে ছাত্রসংখ্যা গড়পড়তা একটু বেশি ছিল। হিফয-উত্তীর্ণ ছাত্রদের বেশিরভাগই দরগা মাদরাসা বা রেঙ্গা মাদরাসা কিংবা কাজিরবাজার মাদরাসায় চলে যেত।
আব্বার সামনে তখন বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রথমত: ভেতর-বাহির শক্তিশালী পক্ষ তৈরি হওয়া। কিছুদিন আগেই দীর্ঘদিনের মুহতামিম মাও. হুসাইন আহমদ সাহেব অব্যাহতি পেয়েছেন। শুনেছি তিনি অনেক প্রভাবশালী ছিলেন। ১৬-১৭ বছর একটানা ইইতেমামির দায়িত্ব পালন করেছেন। তারপরও ইহজগতের নিয়মানুযায়ী বিদায় নিতে হয়েছে। অন্য আরো শক্তিশালী পক্ষ তৈরি হয়েগেছে ইতিমধ্যে। তার দেখানো পথে অথবা তার অগোচরে।
মাও. হুসাইন আহমদ সাহেবের অব্যবহিত পরেই মুহতামিম হন নয়াসড়ক মসজিদের তখনকার পেশ ইমাম ও খতিব শায়খুল হাদিস মাও. আব্দুল মালিক মুবারকপুরি। ভারপ্রাপ্ত না দায়িত্বপ্রাপ্ত। জানি না। শুনেছি, তিনি দুই মাস ইহতেমামি করেই অব্যাহতি নেন।
দ্বিতীয়ত: শিক্ষা-দীক্ষার মান অধোগামী।
তৃতীয়ত: নয়াসড়ক মাদরাসা সিলেটের প্রাচীনতম একটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.’র ইশারায় প্রতিষ্ঠিত। দেশ-বিদেশের বুর্জুগানে কেরামের পদস্পর্শে ধন্য। তারপরও মাদরাসা হাফিজি মাদরাসা হিসেবে পরিচিত। এবং সেই হিসেবে মূল্যায়িত হয়।
চতুর্থত: আর্থিক হালতও প্রায় ভঙ্গুর। ছোটখাটো আরো সমস্যা আছে। যেগুলো মাদারিসে কওমিয়্যায় হরহামেশা লেগে থাকে।
সবকিছু মেইনটেইন করে মাদরাসাকে বড় মাদরাসায়, প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করা। পড়ালেখার মান উন্নত করা। ভেতর-বাহির পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ক দূরিভুত করা বিরাট চ্যালেঞ্জই বটে।
তিনি সেই লক্ষ্যপানে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যান। সিলেটের বুকে নয়াসড়ক মাদরাসাকে উচ্চতর দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অল্পদিনে একে একে ধারাবাহিকভাবে জালালাইন, মিশকাত, দাওরায়ে হাদিস জামাত খুলেছেন। হিফয বিভাগের মানোন্নয়নে হিফজ-জগতের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়ে এসেছিলেন। কিতাব-বিভাগেও একঝাঁক সুযোগ্য শিক্ষকমন্ডলী নিয়োগ দিয়েছিলেন। যারা ইতিপূর্বে প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় মুহাদ্দিস-শায়খুল হাদিস হিসেবে সুনাম-সুখ্যাতি কুড়িয়েছেন। শায়খুল হাদিস আল্লামা ফয়জুল বারী মহিষপুরি রহ.’র কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তিনি দারুল উলুম কানাইঘাট থেকে বিদায় নিতেই ওয়ালিদে মুহতারাম রহ. তাঁকে অত্যন্ত তাজিমের সাথে, আড়ম্বরপূর্ণভাবে নয়াসড়ক মাদরাসায় হাদিসের মসনদে আসীন করেন এবং প্রধান শায়খুল হাদিস হিসেবে সম্মানিত করেন।
হিফয বিভাগসহ কিতাব-বিভাগেও ছাত্রসংখ্যা অতীতের সমস্ত রেকর্ড ধীরে ধীরে ভাঙতে থাকে। সর্বজনের কাছে হাফিজিয়া মাদরাসাকে জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া নামে পরিচিত করান। উল্লেখ্য, সর্বজনের কাছে বড় মাদরাসা হিসেবে, মীরবক্সটুলা এলাকা সংযুক্ত করতে এবং সর্বোপরি শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ রহ.’র ফয়েজ ও বরকত লাভের উদ্দেশ্যে তিনি ইহতেমামির দায়িত্ব পাওয়ার পরই ২০০৩-০৪ ইং সনে মাদরসার দীর্ঘদিনের নাম মাদরাসায়ে হাফিজিয়া ইসলামিয়া নয়াসড়ক পরিবর্তন করে জামিয়া ইসলামিয়া হুসাইনিয়া মীরবক্সটুলা, নয়াসড়ক সিলেট নামকরণ করেন।
একটি উদীয়মান বৃক্ষের চারাকে মহীরূহ করতে যতটুকুু শ্রম, মেধা, প্রতিভা, ধৈর্য, মানসিক স্থিরতা থাকতে হয়। তা ছিল আমার মরহুম ওয়ালিদে মুহতারামের। অনেক পরে যখন পিতা-পুত্র কিছুটা গল্প করার বয়স হয়। তখন তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। “আপনি নয়াসড়ক মাদরাসায় একেবারে নির্জীব হয়ে থাকলেন। আপনার উপর দিয়ে অনেক ঝড়-তোফান গেল আপনি সেটা নিয়ে মোটেই মাথা ঘামালেন না। বিচলিত হলেন না। কারো সাথে এতটুকু শক্ত আচরণ করলেন না। কেন?” তিনি গম্ভীরমুখে মাথায় আঙুল দিয়ে ইশারা করে বললেন, “দুনিয়ায় বড় কাজ করতে গেলে ব্রেইন কাজে লাগাতে হয়। উত্তেজনা, প্রতিশোধ পরায়ণ মন নিয়ে বড় কাজ করা যায় না। বাল্যকালে আমার অনেক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা ছিল। আশপাশের সকলেই ভয় পেত। বাঘ ডাকত। কিন্তু বড় কাজ, মহান কর্ম করতে গেলে ধৈর্য, স্থিরতা, বুদ্ধিমত্তার পরিচয় সবসময়ই দিতে হয়। একটু এদিক-সেদিক হলেই সব আয়োজন ভেস্তে যেতে পারে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, ভবিষ্যত টার্গেট নষ্ট হয়ে যাবে।”
নয়াসড়ক মাদরাসায় থাকাকালীন যখন বড় রকমের ঝড়-ঝাপ্টা এসেছে তখন দেখতাম কারো সাথে কথা প্রসঙ্গে বলতেন, এটা শায়খুল ইসলাম মাদানী রহ.’র স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান। আমি এটা এরকম অবহেলায়-অনাদরে রেখে যাব না। এটা বড় প্রতিষ্ঠানে রূপ দিব। যাতে মাদানী রহ.’র নামের সুবিচার হয়। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান বলে যেকেউ গর্ব করবে, সম্মান করবে। পরে নাহয় এখান থেকে আমার রিজিক যাবে। এর আগে নয়। অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে কথাগুলো বলতেন। আমার সবসময়ই তার এই দৃঢ়চেতা মনোভাব চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
আমি আমার পিতার জীবনের কঠিন অধ্যয়গুলো দেখেছি। তার দুঃস্বময়ে আমাকে পাশে রেখেছেন। অনেক তীক্ষ্ম কথা, মনোভাব শেয়ার করতেন। বিশেষ করে যখন সিলেটের প্রাচীনতম বিদ্যাপিঠ জামিয়া হুসাইনিয়া রাণাপিং মাদরাসায় মুহতামিম নিযুক্ত হন। মাদরাসার শিক্ষকগণকে কোনো কাজে বাসায় পাঠালে বলতেন, আমার ছেলে ইয়াহইয়া আছে। আমার কাজ সে করে দিবে। এটা তিনি অনেককেই বলতেন।
রাণাপিং মাদরাসায় যখন অস্থিরতা শুরু হলো। মাদরাসায় পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হয়েগেছে। এমনকি একটি পক্ষ মাদরাসার গেইটে পর্যন্ত তালা মেরে দিয়েছে। তখন মাদরাসা-কর্তৃপক্ষ আমাদের বাসায় এসে ওয়ালীদ সাহেবকে বিনীত অনুরোধ করে, মাদরাসাটির হাল ধরতে। ওয়ালীদ সাহেবও বিনয়ের সাথে তা খারিজ করে দেন। বললেন, মাদরাসার ইহতেমামি করার মানসিকতা আমার মোটেও ছিল না। পিতৃতূল্য শ্রদ্ধেয় উস্তাদদের অনুরোধে-আদেশে সেটা পালন করেছি। আর সেটা ভালো লাগছে না। এখন বিদেশ-বাড়ি যাবার প্রচেষ্ঠায় আছি।
মাদরাসা-কর্তৃপক্ষও নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকে। আমি তখন মেহমানদারি করছিলাম। আমাকেও একজন বললেন, আব্বাকে রাজি করাতে। আমি মুচকি হেসে আব্বার দিকে তাকালাম। আব্বা বললেন, সে আরেক মুহতামিম। মেহমান বললেন, মুহতামিমের ছেলে মুহতামিম তো হবেই।
শেষপর্যন্ত তাদের রিকোয়েস্ট, শত অনুরোধ এবং আল্লামা রিয়াসত আলী চকরিয়া রহ.’র স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে মাদরাসার ইহতেমামির দায়িত্ব তাঁকে নিতে হয়।
আলহামদুল্লিাহ, রাণাপিং মাদরাসার দীর্ঘদিনের ঝুট-ঝামেলা আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন তাঁর মাধ্যমে নিঃশেষ করে দেন। তিনি মাদরাসার ভেতর-বাহির সমস্ত ফেতনা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা এবং সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করেন। মাদরাসার রেগুলার কার্যক্রম চালু করেন। যোগ্য, দক্ষ, প্রাজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী নিয়োগ করেন। কয়েক বছরের গোলযোগ থাকার পরও দাওরায়ে হাদিসের জামাতসহ প্রতিটি জামাত, প্রতিটি বিভাগ চালু করেন। চোখের পলকেই মাদরাসার চেহারা আমূল পাল্টে ফেলেন।
আমার ওয়ালিদে মুহতারামের এটা একটা কারামত বলা যায়। তিনি কোনো প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক হালতে ইহতেমামির দায়িত্ব পাননি। ফেতনা, পক্ষ-বিক্ষের বিতর্ক এমনকি এলাকাবাসির দ্বন্দ্ব যেসব প্রতিষ্ঠানে তিনি সেখানে মুহতামিমের দায়িত্ব পান। তার শুধু মুদারিরস বা শিক্ষক হিসেবে মাদরাসার খেদমত করার চিন্তাধারা থাকলেও সিলেটের মন্যবর উলামায়ে কেরামের আদেশ-অনুরোধে এইসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে হয়। এমনকি জকিগঞ্জের শাহগলী মাদরাসায়ও। যেটার পরিচালনা আমি দেখিনি। শুনেছি।
তার পরিচালিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সবধরণের ফেতনা-ফাসাদ মুক্ত হয়। শিক্ষা-দীক্ষার পরিবেশ তৈরি হয়। মাদরাসার আয়-উন্নতির বিভিন্ন পথ বের হয়। এমনকি আযাদ দ্বীনী এদ্বারা বোর্ডের ফাইনাল পরীক্ষার যে কেন্দ্রে ফেতনার আশঙ্কা থাকত বোর্ড-মুরুব্বীগণ তাঁকে সেখানে পাঠাতেন। তার অনন্য দক্ষতায় ও বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালনায় কেন্দ্রে কোনোরূপ গোলযোগ হত না।
রাণাপিং মাদরাসায় থাকাকালিন তাঁর আমেরিকা-গমণ হয়ে যায়। সেখানে দারুল উলুম নিউইয়র্কে তিনি সম্মানিত মুহাদ্দিস হিসেবে নিযুক্ত হন। দারুল উলুম নিউইয়র্ক পূর্বে মিশকাত জামাত পর্যন্ত ছিল। তাঁর আসার সংবাদ পেয়ে কর্তৃপক্ষ দাওরায়ে হাদিসের জামাত শুরু করার উদ্যোগ নেয়। তাঁর সাথে পরামর্শ করে। তিনি অত্যন্ত সুন্দর ও গোছানো পরামর্শ দেন। তিনি দারুল উলুমের কর্তৃপক্ষের একজন অভিভাবক হিসেবে পরিচালনা করেন। তার পূর্বের বিপুল অভিজ্ঞতা কর্তৃপক্ষ সাদরে গৃহণ করতো এবং উপকৃতও হত। ফলশ্রুতিতে এখনও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ তার স্মৃতির প্রতি সবসময় সম্মান প্রদর্শন করে।
মানুষের প্রতি দয়া-ভালোবাসা কী পরিমাণ ছিল। এটা যারা তাকে দেখেছে তারা জানে, বুঝে। কারো প্রতি কখনো কোনো অভিযোগ করেননি। মনে এতটুকু কষ্ট রাখেননি। কারো আঘাতের প্রতিশোধ নেয়া দূরের কথা কারো উপকার ছাড়া অপকার করতেন না। প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা পারিবারিক অনেকক্ষেত্রে দেখেছি, অধীনস্ত বা সহকর্মী কিংবা নিকটাত্মীয় কেউ কষ্ট দিয়েছে। অবজ্ঞা করেছে। কখনো এটা নিয়ে অনুযোগ করতেন না। এমনকি এবিষয়ে কথাই বলতেন না।
তার বিচারিক দক্ষতা, ফেতনা মেটানোর পারঙ্গমতা অসাধারণ ছিল। আগেই বলেছি আযাদ দ্বীনি এদ্বারা বোর্ডের যখন বড় কোনো কেন্দ্রে গন্ডগোল লাগত তখন বোর্ডের মুরব্বিরা তাঁকে দায়িত্ব দিয়ে সেখানে পাঠাতেন। নয়াসড়ক মাদরাসায় আমার একজন হুজুর একটি ঘটনা বলেছেন, কোনো এক বছরের বোর্ডের ফাইনাল পরীক্ষায়, জামিয়া কাসিমুল উলুম দরগায় দাওরায়ে হাদিসের ছাত্রদের দু’টি পক্ষের মধ্যে বিরাট দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। পরীক্ষা বানচালের হুমকি আসতে থাকে। তিনি সেখানে হলের জিম্মাদার হিসেবে গমণ করেন। দু’টি পক্ষই যখন তার ব্যক্তিত্বের প্রভাব এবং চেহারার চাহনি পরখ করলেন তখন এমনিতেই হাঙ্গামা ও কূটকৌশল থেকে সকলেই সরে যান। এরকম ঘটনা সিলেটের আরেকটি বড় মাদরাসায় হতে যাচ্ছিল। আল্লাহ পাক তার ওসিলায় নিরসন করেন। একবার ঢাকাদক্ষিণ হুসাইনিয়া মাদরাসায় জমিয়ত-খেলাফতকেন্দ্রীক বড় রকমের গন্ডগোল লেগে যাবার আশঙ্কা ছিল। তখনও তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এখানেও তিনি সফল।
এলাকায় মসজিদ-মাদরাসা-ঈদগাহকেন্দ্রীক ফেতনা যখন চরম আকার ধারণ করত। তখন সকলেই তাকে নিয়ে যেত। এমনিতে তিনি এসবে যেতেন না। এসব বিষয়ে মাথা ঘামাতেন না। এমনকি আমি কখনো কোনো ঈদে আব্বাকে বাড়িতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। তিনি যেই বিচারে একবার গিয়েছেন। আর কখনো যেতে হয়নি। মূলত: বিচারই শেষ হয়ে যেত।
সামাজিক উন্নয়ন, মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ করে মানুষের আর্থিক উন্নয়নে তাঁর অনেক অবদান আছে। কেউ কোনো অসুবিধায় পড়ে তার কাছে এলে তিনি কোনো না কোনো পথ বাতলে দিতেন। তাকে সুন্দর এবং কার্যকর পরামর্শ দিতেন।
আমি দেখেছি, তিন গ্রুপ মানুষ তার কাছে সবসময়ই আসতেন। এক. অসুস্থ ব্যক্তি। আর্থিক অসচ্ছল। শহরে আত্মীয় বলতে আমরাই। তাদেরকে ডাক্তার দেখানো। হাসপাতালে ভর্তি করানো। এসব তিনি নিজে করতেন। অনেক সময় আমাকে দিয়েও করাতেন। টাকা-পয়সা কম রাখতে ডাক্তারকে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করতেন। প্রায়ই আমাদের বাসায় আত্মীয়-স্বজন এসে থাকতেন। ডাক্তার দেখাতে কিংবা কোনো বিশেষ অসুবিধায়।
দুই. বিদেশগামী আর্থিক অসচ্ছল মানুষ। কেউ দয়াপরবশ হয়ে ভিসা দিয়েছে কিংবা নিজেরা কষ্টেসৃষ্টে ভিসার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু টিকেট করার সামর্থ নেই। পরবর্তীতে ঋণ পরিশোধ করার মর্মে ট্রাভেলস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ব্যবস্থা করে দিতেন। অনেক সময় তিনি নিজে কোনোভাবে টাকা-পয়সা ম্যানেজ করে টিকেটের ব্যবস্থা করে দিতেন। প্রায়ই এই দুই গ্রুপের সাথে আমাকে জড়িয়ে দিতেন। যদ্দরুণ আমি দেখেছি তাঁর ব্যস্ততা। কৃতজ্ঞতার ভাষা আমি এই অভাবি মানুষগুলোর চোখে দেখেছি। আম্মার কাছে অনেক সময় এই বিষয়ে অনুযোগ করতাম যে, আব্বাকে দেখে মনে হয় নিজের জন্যে অথবা তার কোনো সন্তানের জন্যে এসব করছেন। আম্মা আমাকে বলতেন, এই মানুষগুলোর দোয়ায় আল্লাহ পাক আমাদেরকে সবকিছু সহজ করে দিচ্ছেন।
তিন. মাদরাসা-মসজিদের দায়িত্বশীলগণ। অনেক বড় বড় আলিম, গণ্যমান্য লোককে দেখেছি তার কাছে আসতে। অভ্যন্তরিণ দ্বন্দ্ব, ফেতনা, আর্থিক অসচ্ছলতা এসব বিষয়ে পরামর্শ করতেন। তিনি সহজ এবং কার্যকর সমাধান বাতলে দিতেন। আর্থিক খাত দেখিয়ে দিতেন। ধর্মপ্রাণ সম্পদশালী দাতার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন।
আমাদের পিতা-মাতা উভয়ই মানুষের উপকার করার বেলায় অনন্য ভূমিকা পালন করেন। কারো উপকার করার পরেও তার পক্ষ থেকে বিশাল অন্যায্য কারবারে তারা মোটেও বিচলিত হননি। উপরন্তু সকলের সাথে সদ্ভাব রাখেন, ভালোবাসা রাখেন, মমতা রাখেন।
আমরা তার সন্তানেরা, তার প্রিয় ছাত্ররা চাই এই মহান পরোপকারী ব্যক্তিকে আজীবন স্মরণ রাখতে। তাকে সকলের কাছে পরিচয় করিয়ে দিতে নয় আমরা পরিচিত হতে চাই যে, তার মতো আমরাও যেন সংযমী, ত্যাগী, বুদ্ধিদীপ্ত সর্বোপরি পরোপকারী হতে পারি। কারো প্রতি এতটুকু ঘৃণা, বিদ্বেষ না রাখতে। সকলের বিপদাপদে, সুখে-দুঃখে আপনজনের মতো কাছে থাকতে।
এককভাবে দান-খয়রাত করা বর্তমান জমানায় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারন বিভিন্ন ব্যস্ততা সকলের অবসর সময়কে গ্রাস করে ফেলেছে। এতটুকু সময় ফুরসত পাবার জো নেই। একজনকে সময় দেওয়া, তার দুর্দশা দেখে দান-খয়রাত করা বিশাল কঠিন। তারওপর অনেকে জোচ্চোরি, মিথ্যা আবদার করতেও ছাড়ে না। ভুল-শুদ্ধ উপস্থিত সময়ে নিরুপণ করা মুশকিল, প্রায় অসম্ভবই। বিভিন্ন দুর্যোগে সকলে সবজায়গায় যেতে পারে না। বিশেষ করে, বিদেশবিঁভূইয়ে যারা অবস্থান করেন তারা তো ইচ্ছে থাকলেও পারে না। তখন চ্যারিটি অগানাইজেশনের দরকার পড়ে। যারা ফিল্ডে থাকে। যাদের এসবের ফিকির আছে। তারা ইনস্ট্যান্ট বুঝতে পারে কোথায় কী দরকার। আমরাও এটা নিয়ে অনেক চিন্তা করেছি, ফিকির করেছি।
বিপদাপদে মানুষের পাশের থাকার আমাদের চিরাচরিত পারিবারিক ঐতিহ্য। যা আমাদের পূর্বপুরুষের ছিল। আমাদের সম্মানিত দাদা-দাদির ছিল। দাদাকে দিন কয়েক মাত্র পেয়েছি। শুনেছি তিনি অত্যন্ত পরহেযগার ও পরোপকারী ব্যক্তি ছিলেন। আর দাদির সাথে আমাদের বাল্যকালের উচ্ছল জিন্দেগী কেটেছে। দেখেছি, এলাকার মানুষ, আত্মীয়-স্বজন প্রায় সময় তার কাছে সাহায্য-সহযোগীতার জন্যে আসতেন। এখন আমাদের মমতাময়ী মা সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। সেই কারনে মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, আমাদেরকে আহ্বান করে। আমরাও শত ব্যস্থতায় তাদের ডাকে সাড়া দিই। সাড়া দিতে হয়।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে চ্যারিটি অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমরা পরামর্শ করে, আমার ছোটভাই দারুল উলুম নিউইয়র্কের শিক্ষক, হাফিয মাও. শিহাবুদ্দীন আহমদ ফরহাদের আবদারে চ্যারিটি অর্গানাইজেশন প্রতিষ্ঠা করি। আমাদের প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, অঢেল স্নেহ-মমতাশীল ওয়ালিদে মুহতারামের নামানুসারে প্রতিষ্ঠা করি, মাওলানা আব্দুল মুমিন রহ. চ্যারিটি অর্গানাইজেশন।

Comments
Post a Comment